আমার মায়ের ঘুমের সমস্যা অনেক দিনের । প্রেশারের ঔষধের সাথে প্রায়শই ঘুমের ঔষধ খেতে হতো । ঔষধ খেলে ঘুম হয়, না খেলে নাই ।
২০১৯ সালের ২৮ শে আগষ্ট রাত …
মায়ের সে রাতে সারপ্রাইজিংলি ঔষধ ছাড়াই খুব সুন্দর ঘুম হয় । সেদিন ছোটমামার বাসায় মা বেড়াতে গিয়েছিলেন । কোথাও বেড়াতে গেলে জায়গা পরিবর্তনের কারণে মায়ের ঘুম এমনিতেই কম হয় । কিন্তু সেদিন রাতে ছোটমামার বাসায় মায়ের খুব ভালো ঘুম হলো । ফজরের সময়ে মা ঘুম থেকে উঠে শুনলেন, তার একমাত্র ছেলেটা রবের কাছে ফিরে গেলেন । দশ বছর বয়সে ইয়াতীম হয়ে যাওয়া যে ছেলেটাকে দীর্ঘ কত গুলো বছর একা একা বড় করেছিলেন স্বামী বিহীন, সেই বুকের ধন চলে গেলো ।
সেনাবাহিনীতে থাকার সময়ে ভাইয়ার কোন সমস্যা হলে মায়ের মনে জানান দিতো । মা সারা রাত ছটফট করতেন । একা একা বারান্দায় বসে কাঁদতেন । পরে খবর আসতো ভাইয়া ট্রেনিং এ আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে কিংবা কোন কারণে অসুস্থ । আমরা বেশ অবাক হতাম । তখন মোবাইল ছিলোনা কিন্তু মা কেমন করে যেন সব বুঝে ফেলতেন ।
যেদিন ভাইয়া চলে গেলো, সেদিন রাতে কেমন করে যেন মা অনেক ঘুমালেন । নির্ভার একটা ঘুম …
মা আমাকে পরে একদিন কথায় কথায় জিজ্ঞাসা করলো, ঐ রাতে এত ঘুম উনার কোথা থেকে আসলো ?
কয়েক সেকেন্ড থেমে জবাবে বলেছিলাম - দুনিয়াবী কষ্ট, যন্ত্রণাগুলো তো ক্ষণিকের । ভাইয়া তার নিশ্চিত গন্তব্যে দুনিয়াী সকল পরীক্ষা থেকে ফারেগ হয়ে ইন শা আল্লাহ উত্তম ভাবে ফিরে গেছে । তাই আল্লাহ আপনাকে সে রাতে নির্ভার রেখেছেন । অনেক পরিশ্রম শেষে সন্তান প্রসব করার পর আমাদের মায়েদের একটা সুন্দর ঘুম হয় । আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’লা দুনিয়া থেকে আপনার সন্তান নিয়ে যাবার পরেও এরকম একটা সুন্দর ঘুম হাদিয়া দিয়েছেন আল’হামদুলিল্লাহ ।
আমরা অনেক সময় অজ্ঞতার কারণে বলে ফেলি, মুমিনদের এত কষ্ট কেন ! এত নামায রোযা করে তারপরও এত পরীক্ষা ?
এক শায়খ বলেছিলেন - this dunya is designed to break our hearts …
মুমিনের হৃদয়গুলো বারবার ভাঙ্গবে, ক্ষত-বিক্ষত হবে, চূর্ণ-বিচূর্ণ হবে । এবং প্রত্যেক আঘাত, প্রত্যেকটা কষ্ট তাকে আরও বেশি তার রবের নিকটবর্তী করবে । সে আরও বেশি তার রবকে ভালোবাসবে কারণ সে জেনে নিয়েছে, তার রব তাকে গাফেল অবস্থায় ছেড়ে দেননি । অস্থায়ী এ দুনিয়ায় বারবার বিপদ দিয়ে, কষ্ট দিয়ে তার রব তাকে স্থায়ী গন্তব্যের কথা স্মরণ করিয়েছেন । যে গন্তব্য হবে অনন্তকালের সুনিশ্চিত একটা গন্তব্য …
গত তিন বছরে মায়ের ঘুমের সমস্যার কিঞ্চিৎ অবনতি হয়েছে । মাঝেমাঝে ছেলেকে স্বপ্নে দেখেন । স্বপ্ন শেষে ঘুম ভাঙ্গলে মাঝ রাতে ছেলের কাছে যাবার জন্য নাকি ব্যাগ গোছাতে থাকেন (নানুর কাছে শোনা ঘটনা)।
কিন্তু গত তিন বছরে যখনই, যতবারই মাকে জিজ্ঞাসা করেছি - কেমন আছেন ? মা জবাবে শুধু একটা শব্দ বলে - আল’হামদুলিল্লাহ ।
মায়ের বলা এই ছোট অথচ ওজনদার শব্দটি জুড়ে থাকে আরশের রবের প্রতি ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতাবোধ ।
কেন কৃতজ্ঞতাবোধ ?
এই যে এই জীবনটাই জীবন না … এই জীবনই শেষ না । মুমিনদের তো বরং ঐ জীবন-ই প্রকৃত জীবন । আল্লাহ রব্বুল আলামীন যদি অনুগ্রহ করেন তবে ঐ নেয়ামত পূর্ণ জীবনে কোন ঘুম থাকবেনা, ঘুম না হবার কষ্টও থাকবেনা । সেই সাথে থাকবেনা বিচ্ছেদের কোন যন্ত্রণা ।
“ তারা নিজেরা তার (জান্নাত) মধ্যে প্রবেশ করবে এবং তাদের বাপ-দাদারা ও স্ত্রী-সন্তানদের মধ্য থেকে যারা সৎকর্মশীল হবে তারাও তাদের সাথে সেখানে যাবে । ফেরেশতারা তাদের কাছে আসবে প্রত্যেক দরজা দিয়ে ।
বলবেঃ তোমাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক। (দুনিয়াতে) তোমাদের সবরের বিনিময়ে আজ তোমরা এর অধিকারী হয়েছো । আর কতইনা চমৎকার এ আখেরাতের গৃহ “
[ সুরা রাদ ২৩-২৪ ]
স্মৃতি_চারণ
--লেখিকা নুসরাত জাহান
https://www.facebook.com/100000620801925/posts/pfbid025mk2Tt1VToLnpZX3RUuckU3m982GC17A8oA9aAiGKq6Xm1Grj96NXcJp9cirJLS6l/?sfnsn=mo&extid=a&mibextid=71jzmv
