আমি তখন কেজি কিংবা ক্লাস ওয়ানে। আমাদের বাসায় কাজ করতে আসে শানু বুয়া। অতো ছোটো বয়সের স্মৃতি - বলতে গেলে তেমন কিছুই টেকে না। কিন্তু শানু বুয়ার কথা আমার মনে থেকে গেছে।
তার কারণ শানু বুয়ার ভাত খাওয়া। শানু বুয়া একসাথে কতোটা ভাত খেতো - এটা বললে আপনি বিশ্বাস করবেন না - অবশ্যই ৫/৬ বছর বয়সে দেখলে বিশ্বাস করতেন না। অপার বিস্ময়ের উপলক্ষ্য।
শানু বুয়া, ভাতের একটা পর্বত নিয়ে বসতো। এক গালে যতোটা ভাত মুখে ঢুকিয়ে দিতো - I swear - আজকাল আমার বয়সী স্বাস্থ্য সচেতন মেয়েরা দুই বেলায় অতোটা ভাত খায় না। বেশীরভাগ মানুষ জানেই না যে অতোটা ভাত মুখে আটে। প্রপার চাইনিজ কিংবা থাই রেস্টোরান্টে যেই ছোটো ভাতের বৌল দেয় না প্রতিজনকে - অতোটা ভাত শানু বুয়ার এক গালের চাইতে কম ছিলো।
তার জীবনটাই ছিলো ভাত খাওয়া-কেন্দ্রিক। ধার্মিক মানুষদের জীবনে নামাজ যেমন একটা আনন্দের বিষয়, শানু বুয়ার জীবনে প্রতিটি বেলা ভাত খাওয়া ছিলো এমন আনন্দের বিষয়।
খুবই সহজ একটা মানুষ। তার চোখে মুখে যে পরিতৃপ্তির বিভা, সেটা ব্যাখ্যাতীত ছিলো। দেখলেই আপনার ভালো লাগবে। কিন্তু এখন আমি যখন ফিরে তাকাই - শানু বুয়া আমাকে গভীর অস্বস্তিতে ফেলে।
একদিকে আমার মনে হয় - প্রতিটি মানুষেরই তো আসলে খাবারের প্রতি এ ধরনের শুকরিয়া থাকা উচিত - না খেয়েও তো আমরা থাকতে পারতাম অভাবে ও অসুখে । আমি আমার জীবনে আর কোনো মানুষ দেখি নাই - যার প্রতি বেলা খাবারে জন্য এতো আনন্দ হোতো।
কিন্তু অন্য দিকে আমার মনে হয় - একটা মানুষ কেন এতো ভাত-কেন্দ্রিক হবে? মানব জীবনের কী নিদারুন অপচয়? আমরা কি শুধু ভাত খেতে পৃথিবীতে এসেছিলাম?
মেহের শাওন দেখলাম তিনি বলেছেন যে আমি মুক্তিযুদ্ধ দেখি নি কিন্তু পদ্মা সেতু দেখেছি - তার চোখে মুখে আনন্দের বিভা। অনেস্টলি - মেহের শাওনকে দেখে আমার শানু বুয়ার ভাত খাওয়ার কথা মনে হয়েছে।
একটা প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষিত মানুষ ২০২২ সালে কীভাবে একটা ব্রীজকে এতো বড় অর্জন মনে করতে পারে ? আমি জেনুইনলি বুঝতে চাই - এরা কীভাবে চিন্তা করে? পুরা একটা মাথা লাগে এদের? জীবনটা কাটাতে? হ্যানিবাল লেকটারকে এরা এদের মাথার কতোটা গিফট করতে পারতো?
………
পদ্মা সেতু কি টেকনোলজিক্যাল মার্ভেল? পৃথিবীতে ১০০ টার উপর সেতু আছে - যেগুলো পদ্মা সেতুর চাইতে লম্বা। সেটাও ‘আমরা’ বানাই নাই - ‘বানিয়েছে’ চাইনিজরা।
আমি আশ্চর্য হয়ে দেখি উচ্চশিক্ষিত ছেলেমেয়ে লিখছে, ওয়ার্ল্ড ব্যাংককে আমরা দেখায়া দিলাম।
কী দেখায়া দিলা ভাই আমার ? ওয়ার্ল্ড ব্যাংক যে দুর্নীতির অভিযোগ করেছিলো সেটাই একচুয়ালি সরকার প্রমাণ করেছে - তাও প্রায় ১০ বছর ধরে। ১০ হাজার কোটি টাকার ব্রীজ ৩০ হাজার কোটিতে গিয়ে ঠেকেছে।
তো এই দুর্নীতির দন্ডি কে দেবে? আপনি দেবেন। কেমনে দেবেন? অতিরিক্ত ট্যাক্স দিয়ে দেবেন।
আপনি একদল চোরের চুরিকে সাবসিডাইজ করছেন - যারা ক্যানাডায়, অস্ট্রিয়েলিয়ায় আপনার টাকা চুরি করে বাড়ী বানাচ্ছে আবার সে কারণে আপনি গর্বিত - এটা কীভাবে সম্ভব?
আপনি যদি শানু বুয়ার মতো গ্রামের সহজ সরল একটি মেয়ে হন - যে অতো শত বোঝে না - যে শুধু ভাতের মধ্যেই জীবনের পরমানন্দ খুঁজে পায় - অল গুড ! আমি বুঝি যে আপনার হয়তো পদ্মার ওপারে জমির দাম বাড়বে। ঈদে হয়তো দ্রুত বরিশাল যেতে পারবেন। এগুলো তো বড় সুবিধা - অস্বীকার করার কোনো উপায় নাই।
কিন্তু আপনি যদি একজন শিক্ষিত সচেতন মানুষ হন কীভাবে আপনি এইরকম চুরির মহোৎসবকে ওউন করেন, ঠিক কীভাবে আপনার মধ্যে গর্বের উদ্গার হয়? আপনার খুলির ভিতরে কী থাকে?
আমি ডাক্তার, ব্যাংকার, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক দেখলাম - তারা অত্যন্ত গর্ব বোধ করছেন। গর্বে অনেক সেতুকামীর বুক সম্ভবত এতো বড় হয়ে গেছে কেউ কেউ ঈর্ষাও বোধ করতে পারে। দুই-তিনজনের পোস্ট পড়ে মনে হোলো—ডিগ্রি শেষ করে আমার এর দশ ভাগের এক ভাগ গর্ব হয় নাই।
বাঙালির গর্ব হওয়ার মেকানিজমটা আসলে কী? আমার নাজানতে - বড় ইচ্ছা করে।
